মাহবুবা লাকি'র গল্প
-আর কতোবার নারী হবো
'দিন ফুরিয়ে যায়রে আমার
মন পুড়িয়ে ছাঁই,
আমি হাঁটছি তো হাঁটছি,মনে হয় চলার এই গতি কোনদিন ফুরাবার নয়।সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে তবুও আজ ঘরে ফেরার কোন তাড়া নেই যেনো।মনের বিষন্নতা ঘিরে ফেলেছে চারিদিক।শশী প্রায়ই আসে নদীর এই সঙ্গম স্থলে। মনের যত প্রশ্ন ভাসিয়ে দেয় আঁধার ঘনিয়ে আসা রাত্রীর নীরবতায় ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে।
পাঁজর ভেঙে চুরমার হয় ফেলে আসা দিনের কথা মনে করে। অবজ্ঞায় হাসি পায় সে সব ভেবে।বেস কাব্য করে বিধাতা দিয়েছিলো আমায় রূপ।পড়ার সাথীরা প্রায়ই বলতো আমি নাকি অনন্ত যৌবনা, চির কৌতুকময়ী মেয়ে।অথচ দেখ আজ কে কোথায় আছে, কারোরই খবর জানি না।
আরও পড়ুন: অন্ধকারে আলোর প্রকাশ
সেই দিনের কথা!যেদিন আমার ভালবাসার মানুষটিকে মুখের উপর থু-তু মেরে চলে এসেছিলাম অচেনা গন্তব্যে। যতটুকু মনে পড়ে, দিনটি ছিলো চারিদিকে সাঁজ-সাঁজ ভাব। ভাসচ্ছে ঢাকা রঙিন আলোর ফুয়ারায়।ছোট বড়ো সবার মনে আনন্দ।প্রতিটি রাস্তা,আসেপাশের গাছ, মার্কেট বহুতল ভবন থেকে শুরু করে পিচঢালা পথের কংক্রিটগুলো অব্দি যেনো লাল, নীল,সবুজবাতির হাট বসিয়েছে।মোড়ে-মোড়ে বসেছে ফুচকা, চটপটি, খেলনা ও ফুলের দোকান।বাংলাদেশের বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে ছোট-বড়ো ব্যবসায়ীদের বানিজ্য এভাবেই জমে ওঠে।একটু খেয়াল করলে দেখা যায়,শরতে শাপলা উৎসব,গ্রীষ্মে ফল উৎসব,বর্ষায় ইলিশ উৎসব, বৈশাখে বৈশাখী মেলা। এ ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন দিবস ও ঋতুতে সৌখীন মানুষদের জন্য নিজেদের কৃষ্টি অনুযায়ী নানান রকম উৎসব আয়োজন। আজ রাস্তায় সব বয়সী মানুষের ভীড়। চারিদিকে শোরগোল চিৎকার, লাউডস্পিকারের প্রচন্ড শব্দ এসে কানের তালা ফাটিয়ে দিচ্ছে।এই প্রহর শেষ হলেই থার্টি-ফাস্ট নাইট।পৌষের মাঝামাঝি সময় হওয়ায় পড়ন্ত বিকেলেই কুয়াশা লেপটে যাচ্ছে গায়ের চাদরে।মাঝে মাঝে হিমশীতল বাতাস এসে কাঁপুনি দিচ্ছে আমার তারুণ্যভরা সুঠাম শরীরে। আর মাত্র চারঘন্টা পরেই এ বছরকে বিদায় জানিয়ে জন্ম নেবে আর একটি নতুন বছর।
আরও পড়ুন: একজন নারী "মা"
নদীর পাশে বসে এসব কি ভাবছি।মাথায় কী গন্ডগোল দেখা দিলো?চারঘন্টা এ অনেক সময়!
এক সেকেন্ডে ঘটে যেতে পারে অযুত-নিযুত লক্ষ কোটি মানুষের জীবন।বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে আবিষ্কার হতে পারে তিন কোটি নতুন গ্রহের সন্ধান। ঘটে যেতে পারে দুঃসাধ্য আরো অনেক কিছু।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় এগারোটা। কোথা দিয়ে এতো সময় পার হয়ে গেলো বুঝে উঠতে পারলাম না।উঠেই দ্রুত পা ফেললাম সদর রাস্তার দিকে।ভাজ্ঞ্যিস এতো রাতে কোন ভূত প্রেত এর দেখা পাইনি।তবে মানুষরূপী অমানুষ হায়ানার ভয় ভেতরে কুড়ে খাচ্ছিলো। পথের ধূলোর অগণিত স্রোত ভেদ করে শীতশুষ্ক ফাটা পা ফেলে উদ্দেশ্যহীন হেঁটে চলেছি ফরিদা বাদ হয়ে টিকাটুলির মোড় ধরে।দীর্ঘদিনের চাপা কষ্টে অভিমানী মন প্রতিবাদী হয়ে বলে,আর নিজ আপন জনের কাছে ফিরে যাবো না।সবাইকে তো দেখলাম চইনলাম,আসলে দূনীয়াটা এক আজব চিড়িয়াখানা!ঘর-সংসারের কোন মোহ এখন আর টানে না আমায়।আমার কেউ নেই, কিছু থাকতে নেই, রঙহীন এক জীবন নিয়ে পড়ে আছি জিন্দালাসের মতো।
আরও পড়ুন: পরকীয়া'র সুখ
তবে এই একলা চলার অদ্ভুত এক শক্তি আমায় তাড়িত করে প্রতিদিন। যতো বাঁধা আসুক না কেনো আমি ছুটতেই থাকবো অবিরাম।জীবন যখন দাঁড় করিয়েছে আগুনের ফুলকির উপর, তখন পুড়ে পুড়ে ছাঁই হয়ে সেই ঋণ শোধ করবো।আমি এখন ছাঁই হয়ে বাতাসে উড়ি আনন্দে,গুনগুনিয়ে গান গাই মহা উল্লাসে। কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা-- মনে মনে।হঠাৎ রাজমনি সিনেমা হলের পাস দিয়ে যাবার পথে চোখ পড়লো একটি পরিচিত মুখ।থমকে দাঁড়ালাম মনে হয় তাকে চিনি।তবে অরুচিকর সাজ-সজ্জা আর অশালীন পোশাক দেখে আসল চেহারায় চিনতেই কষ্ট হচ্ছে।এটা ঠিক, পোশাক বা সাজ -সজ্জা যার-যার ব্যক্তিগত ব্যাপার!আমার কাছে ব্যাক্তিত্বই আসল কথা।তবে যে যাই বলুক, মেয়েটি দেখতে সুন্দর ছিলো।বয়স আর কতো হবে আঠারো বা ঊনিশ।লাইট পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো কয়েক জনের সাথে। সম্ভবত কিছু একটা নিয়ে তর্ক চলছিলো। ভেতর গলি থেকে এক যুবক মেয়েটির হাতে কিছু টাকা দিতেই নষ্ট হাসির ঝিলিক দিয়ে আসেপাশে তাকিয়ে ব্যাগে টাকাটা রাখলো।অতঃপর সেখানে একটি লাল রঙের গাড়ি এসে থামতেই দুই যুবক সহ মেয়েটি গাড়িতে উঠে উধাও হয়।
আরও পড়ুন: প্রবাসীর বউ
এগুলো দেখে একটি ঘোরের মধ্যেই ছিলাম।কি দেখলাম, কি শুনলাম,হ্যাঁ মনে পড়েছে, তাকে চিনি তো। শিল্পকলার বাৎসরিক উৎসবে উচ্চ পদস্থ এক কর্মকর্তা র সাথে দেখেছিলাম।সেদিন শিশুকিশোর মেলার একটি মিটিং এ গিয়েছিলাম।ওইদিন দেখেছিলাম উঠতি এক ব্যাবসায়ীর সাথে একজন তাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন।সেদিন তার পরনে ছিলো রুচিশীল পোশাক, চালচলনে ছিলো সরল আভা এবং নাম বলেছিলো মোনালিসা।কিন্তু সেই মেয়েটি এতো রাতে এখানে?বুঝে উঠতে পারলাম না।তাকিয়ে দেখি আরো কয়েকটি মেয়ে ভেতর গলি দিয়ে বের হচ্ছে। তাদের প্রত্যেককেই দেখে মনে হয়েছিলো সঙের পুতুল।আসল চেহারা ঢাকা পড়েছে রঙিন মেকাপের নিচে।আমি তাদের একজনের কাছে জানতে চাইলাম, মোনালিসা এখানে? অন্য একটি মেয়ে বিকৃত হাসিতে ঢলে পড়ে বলে কি কয়রে লুনা?মোনালিসা কি আর মোনালিসা আছে?সে তো এখন লিসা।এই সময়ের টপ হিরোইন।তবে ওর কথা দিয়ে কি দরকার, আসবেন নাকি এই লাইনে।আমাদের সাথে ট্রেনের বগির মতো দাঁড়িয়ে যান।ইনকাম ভালো বলেই আবার অট্টহাসিতে গলে পড়ে মেয়েটি।
আমি আর একবার ভীত সন্ত্রাস হয়ে দ্রুত পা বাড়াই গন্তব্যে।
আরও পড়ুন: চৈত্রের বিকেল
যাক গিয়ে কে কি হলো তা দিয়ে আমার কি কাজ, ভাবতেই বিজয়নগর হয়ে দৈনিক বাংলার দিকে পা বাড়াতেই ধূলিমাখা পা দুটি ব্যাথায় কুকড়ে ওঠে।আই ল্যান্ডের উপর কিছুক্ষণ পা উঁচিয়ে রেখে চেয়ে থাকি আর মনে মনে শীতে ফেটে যাওয়া পা দুটির কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।কেননা সেই জন্মের পর থেকে এই অব্দি আমার দেহটাকে বহন করে চলেছে।কতদিন আমার টাকা জমানোর উদারতায়,সময় এবং রিকশা ভাড়া বাঁচাতে ওর প্রতি হয়েছি নির্মম নির্দয়। এখন বয়স হয়েছে কিছুটা সে থামতে চায়, বিশ্রাম চায়, ঠিক আমার মতো।যেমন আমি চাই প্রিয়জনের থরো থরো ছোঁয়া। আঁকতে চাই সুখি সমৃদ্ধ একটি গৃহকোণ।আমার ধনুক বাকানো কমলা কোয়া ঠোঁট দুটিতে স্পর্শ করে নেচে ওঠুক অনামিকা তার গতিহীন ছন্দে।
আচমকা কাঁধে ঝোলানো ভারী ব্যাগটা আমার আনাড়ি ভাবনাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।এসব কী অনুস্বপ্ন দেখছি।এগুলো তো আমার কোন ইচ্ছার রঙ না।এসব দেখতেও মানা,ভাবতেও ঘৃণা। একদিন আমার ঘাতক প্রিয়জনকে লিখেছিলাম, "ভালবাসা সে তো নষ্ট মুখের লালা।"
আরও পড়ুন: কাবিননামা
যেদিন জেনেছিলাম অতি শীতল,অতি সরল,আর তরল পানীয়। আঁকাবাঁকা সব পাত্রই তার পছন্দ এবং যখন যে পাত্রে যায় সেই পাত্রের আকার ধারণ করে।সে কামুক,লম্পট, নিঃসন্দেহে একটি বলদ পশু। আমার লেখা চিঠির আক্রোশে পেতেছিলো গোপন ফাঁদ।ছলে বলে কি করে আমার চরিত্রের উপর দাগ বসানো যায় এমন সব কুট কৌশল রপ্ত করতে থাকে।কারণ তার জানা ছিলো,আমি অনিয়ম ভাঙি, ভূমিকম্পন সৃষ্টি করি, কাউকে ডরাই না,ঝড়ের মতো ভেঙেচুরে দুমড়ে দেই,আমি আগুনের লেলিহান শিখা,আমি রক্ত-রবীর মতো দুত্যি।তার কাছে তো বিনয়ী আহ্লাদী ময়নাপাখি নই। তবে এটা ঠিক খুব ভালবেসেছিলাম তাকে যেমন
বিশ্বাসও করেছিলাম ততোখানি।এক ফাগুনের বসন্তে প্রিয়তমর বুকের পাটাতনে কান পেতে শুনেছিলাম সেতারে ভৈরবীর রাগ।বুকের কার্ণিশে নাক ডুবিয়ে অনুভব করেছিলাম ভালবাসার শুদ্ধতা। সে রাতে দুজনার ভেতর ছিলো না কোন জড়তা, ভয়।মনে হয়েছিলো সমুদ্রের মতো বিশাল আর আকাশের মতো উদার আমার প্রিয়তমর হৃদয়। সেখানে আমার সংসার ছিলো, ছিলো আদর,ভালোবাসা,মান-অভিমান আর ছিলো প্রেম ও প্রণয়ের খুঁনসুটি।কখনো ছিলো না অবিশ্বাস, ছিলো না হারানোর ভয় ও হতাশায় ডুবে যাওয়া।ছিলো শুধু নির্ভরতা ও ভরসার এক বড় উঠোন।
আরও পড়ুন : জ্যোৎস্নার স্নান
এসব ভাবতেই বুকের মঝাখানের তিলটা সুপ্ত কাকুতিতে করুণ কান্নায় ভাসিয়ে তোলে দু আখির তীর।তার অতীত মূল্যবোধের কথা ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে যায়,একদিন আমার প্রিয়তম এখানে চুমু খেয়েছিলো বারবার বহুবার।ভালবাসার বর্ষা ঝরিয়ে আমাকে উপমা দিয়েছিলো সেই বহুল আলোচিত গানটির দুই লাইন।
"ভালবাসা যতো বড় জীবন ততো বড়ো নয়
তোমায় নিয়ে হাজার বছর বাঁচতে বড় ইচ্ছে হয়"
আমি সেদিন বুঝিনি তার বাঁকা চোখের চাহনি। সেই ফুলসজ্জার অন্তিম তিথি হতে ঘাতকতার শেষ প্রহর প্রর্যন্ত আমার জট পাকানো কাব্যিক চুলে মুখ লুকিয়ে খুঁজেছিলো কামনার সৌরভ। রাতের গুমোট আঁধারে শরীরে বিদ্যুৎ খেলে চোখে চোখ রেখে লোভাতুর দৃষ্টিতে আবৃত্তি করেছিলো, "বিস্ময়কর কোন সুপ্রভাত আমায় দিও না,
আরও পড়ুন : একদিন আমিও ছিলাম
দাও আমায় যা আছে এই মহাকালের ভেতর প্রবিষ্ট! তার অভিনয়,শঠতা,কৃত্রিমতা,ধূর্ততা, কুরুচিপূর্ণ মানষিকতা কিছুদিনের ভেতরেই উন্মোচিত হওয়া শুরু করলো।ঠিক যখন আমি গর্ভবতী হওয়ার খবরটি তাকে জানালাম।প্রিয়তম তার নষ্ট ফাঁদের কিঞ্চিৎ লালসায় কখন যে আমার স্রোতবাহী যমুনার বুকে ডুবুরি হয়েছিলো।অতি যত্নে খুঁটে খুঁটে লাঙল চালিয়ে বীজ বপন করেছিলো আমার উর্বর জমিতে।আমি স্বপ্ন আকাঙ্খায় লালন করেছিলাম নাভীমূলে বেড়ে ওঠা সুপ্ত ভ্রুণটিকে।দিনে দিনে ভ্রুণ ফুটে উঁকি দিলো লকলকে সবুজ পাতা।ও আমার চন্দ্রমল্লিকা। সেদিন চন্দ্রকে বুকে ধারণ করে আমি আকাশ হয়েছিলাম।ওর নিরাপদ আশ্রয় গড়তে বৃষ্টি হয়ে ধরায় নেমেছিলাম। পাহাড় সমান লজ্জাকে থমকে দিয়েছি, প্রতিবেশী ও আপনজনের তিতা কথার বিদ্যুৎকে টপকে গিয়েছি, জীবনের কঠিনতম সময়ের ঘূর্ণিকে চেয়ে চেয়ে দেখেছি বোবা প্রাণীর মতো,লজ্জা,ঘৃণা,অপবাদ,নষ্টা, ভ্রষ্টার মতো সব পচা কথা হজম করেছি।সে শুধু চন্দ্রমল্লিকার স্বচ্ছ জন্মের একটি ঠিকানার জন্য।
তবে কেউ কখনো আমাকে ঠকাতে পারেনি, ঠকিয়েছে শুধু আমার আপন প্রিয়তম। সেই ঠকবাজ,স্বার্থপর ভণ্ড, প্রেমিকের চোখে প্রতিবার দেখেছি আমার ভালোবাসার স্বপ্নকে ভস্মিভূত হতে।তবুও হাল ছাড়িনি, চন্দ্রকে বুকে নিয়ে যুদ্ধটা করে গিয়েছি একাই। একসময় সমাজ ও আমার প্রবল ইচ্ছায় তাকে নামে মাত্র সই করে কাবিননামা করি।সেদিন আমার সুস্থ মস্তিষ্ককে আমি চুরমার হতে দেখেছি।ঘর আমার একটা হয়েছে খুব নড়বড়ে, যে কোন সময় ভেঙে যেতে পারে।সব কিছু মেনে নিয়েই একই ছাদের নিচে অচেনা মানুষ হয়ে দিন কাটিয়েছি।
আরও পড়ুন : রাতের অন্ধকারে
আমার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও স্বচ্ছ বিচক্ষণতা দিয়ে বহুবার পরিমাপ করেছি ওর নারী খেকো রূপ।কতরাত, কতো কতো তিনশত পঁয়ষট্টিদিন অবচেতন মন ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরিয়েছে চোখে তীব্র ঘৃণায়।আর এদিকে চন্দ্রকে বুকে নিয়ে নিরাপদে বাঁচার তাগিদে বৈরী সমাজের সাথে চলেছে আমার তুমুল লড়াই।একদিন আমার কাব্যিক বক্তব্য গুঞ্জন জাগাতে চেয়েছিলো কাকতাড়ুয়া প্রিয়ার মিথ্যা আশ্বাসে।ধর্মকে যখন অধর্মের খোঁয়াড় বানায় আপনজন সমাজপতিরা, তখন কলম এমনিতেই গর্জে ওঠে।
কারণ
"ভন্ড বিধাতারা যত্রতত্র শুধু মল ত্যাগের মতো বীজ বুনে যায়, ফসলের কোন খোঁজ রাখেনা।"
এই সমাজ ও সভ্যতার বিধাতা তো সেই, যার কাড়ি কাড়ি টাকা আছে। রাজধানীর রাজকীয় জীবনের চারিদিকে এতো আয়োজনের ভীড়ে আমার রঙহীন ফ্যাকাসে জীবনের অপ্রয়োজনীয় একাকি হেঁটে চলা।মতিঝিলের দিকে পা বাড়াতেই মনটা কেঁপে উঠলো কোনদিক দিয়ে এগোবো ভাবছি।হঠাৎ ভেতরে অস্থিরতা! পাঁজরের দুইপাড় ভেঙে শুধু কান্নার শব্দ ছাড়া আর কিছু কানে আসে না।আমার ভাবনায় চিবুক স্পর্শ করি,দেখি বেদনা ও হতাশাভরা মুখখানি জুড়ে ছড়িয়ে আছে জলের মতো কষ্টের ছাপ।চঞ্চলা হরিণের মতো চোখদুটি আজ বড়োই অস্থির, দেহের বাঁকে বাঁকে ভর করেছে যোদ্ধাহত নগরীর মতো ধ্বংস্তুপের ভাগাড়।চোখের কোনে একফোঁটা নীল জল, এটুকু রেখেছি আমার চন্দ্রমল্লিকার জন্য।এ জলে আমি শাপলা পদ্ম ফুটাবো। সুখের পানসী বেয়ে আমার চন্দ্র ঢেউ তুলবে মহা আনন্দে।মন তাড়াতাড়ি ছুটে গেলো মেয়ের কাছে, একটি রিকশা ডেকে বাড়ির পথে রওনা দেই।আমাকে তো ফিরতে হবে।ছোট একটা পৃথিবী আছে,ঘর আছে,হাঁড়ি পাতিল আছে,আর আছে আমার বুকের ধন। যাকে নিয়ে এই জগৎ সংসারে আমার নিরান্তর ছুটে চলা।নিকষ কালো আঁধারে সেই ঘরে আমার সাথে আরো থাকে বিষাদ-বেদনা,ভাঙা-চোরা কিছু স্বপ্ন,ঢেউ তোলা নদীতে চলমান নৌকার হঠাৎ পাল ছেঁড়ার শব্দ আর মাঝে মাঝে ভাঙা আলোর জ্যোৎস্না।হ্যাঁ মাঝে-মাঝে চন্দ্রমল্লিকার ঠা-ঠা হাসির উম্মাদে আমার ভেতর কিছুক্ষণের জন্য হলেও পুঞ্জ পুঞ্জ খুশি অভিভূত হয়।যখন আমি ঘরে ফিরি তখন মাঝরাত,জানালার পর্দা সরে টেবিলের উপর যুবতি চাঁদের একফালি সোনা ঝরা জোস্না ঝিলিক মারছে,মোড়ে কিছু ক্ষুদার্ত কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে,দূরে পাড়ায় পাড়ায় প্রহরীদের বাঁশির ডাক, অতঃপর চুপচাপ মহল্লা।
আরও পড়ুন: বৈশাখী
ঐতিহ্যবাহী ঢাকার পুরাতন এলাকার মেয়ে আমি।এই এলাকায় রায় বাহাদুর থেকে বহু কবি, লেখক,সাহিত্যিক, ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তির বসবাস ছিলো।১৯৩৭সালে নির্মিত লাল রঙের গেন্ডারিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ভবনটি আজও এর স্বাক্ষ্য বহন করে। এই পুরান ঢাকার অলিতে- গলিতে আজও আমার দূরন্তপনার স্মৃতি খুঁজে পাই।আমার জন্ম,অপহৃত কৈশোর, বাবা মায়ের শরীরের ঘ্রাণ, ভাইবোন মিলে হোটেলের কাচ্চি খাওয়াও পড়ার সাথীদের কোলাহল। এখানকার প্রত্যকেই সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত, তবে দুই একটি বুড়ো শকুনের শিকারি চোখ ও আছে।যারা অন্যের খুঁত ধরে বেড়ায়, গায়ে পড়ে কথা বলে।শান্তিপ্রিয় ভাবে পুরান ঐতিহ্য ধরে রেখেছে নানা রকম উৎসবের মাধ্যমে। মনে পড়ছে থার্টি-ফাস্ট নাইটের এই দিনে ঢাকা উইনিভার্সিটি এলাকায় একদল কুকুরের হাতে বাঁধন লাঞ্চিত হয়েছিলো। এসব দেখে সমাজ ও সভ্যতা নারীর পোষাককে দায়ী করেছিলো।অপরদিকে সুযোগ সন্ধানী জয়নাল হাজারী পুরুষতন্ত্রের লোলুপ দৃষ্টিকে ধিক্কার না দিয়ে বোকার মতো উলটো উষ্কানিমূলক বক্তব্যে বলেছিলেন।এতো রাতে বাঁধন ওখানে কেন গিয়েছিলো?আমি এখনো খুঁজে পাই না, নারীর রাতে বের হবার পেছনে এতো নিষেধাজ্ঞা কেনো?তার জরুরি কোন প্রয়োজন হতে পারে, অসুস্থ হতে পারে, ডাক্তারের কাছে যেতে হতে পারে।নারী পথে বের হলেই কি লুন্ঠিত হবে, বস্ত্র হরন হবে, দেহে কুকুরের কামড় পড়বে?এটা গনতান্ত্রিক রাস্ট্র,পুরুষের মতো এখানে নারীও সমান নাগরিক। উৎসব আয়োজনে,কর্মক্ষেত্রে নারীর ও সম-অধিকার রয়েছে।তবে সে বারের বইমেলায় জয়নাল হাজারি "বাঁধনের বিচার চাই " নামে একটি বই লিখে পুরুষতন্ত্রের সুযোগটা লুফে নিতে
ভুল করেন নি।
প্রশাসন এসব দিনের থেকে রাতে যতোই তৎপর থাকুক না কেনো বদমায়েশ ও সুযোগ সন্ধানীরা ঠিকই এসব দিনগুলোকে বেছে নেয়।ঘটায় নানা রকম অঘটন। আমরা নিজেকে ধনে জ্ঞানে যতোই প্রজ্ঞাবান মনে করি না কেনো।বাইরে এর লেসমাত্র প্রতিফলন নেই।সুস্থধারার সমাজ ও সংস্কৃতির কথা বলতেই, সাহিত্যের প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব ডঃ আহমেদ শরীফ এর উক্তিটি ছিলো যুগোপযোগী। তিনি বলেছিলেন,"নির্ভেজাল মানব সংস্কৃতির কথা আমরা কখনোই ভাবতে পারি না।"বর্তমানে যেভাবে সংস্কৃতির কলকব্জা ঘোরে,তাতে যে বা যাদের তত্বাবধানে নিয়োজিত কর্তাব্যক্তিদের বিভ্রান্তিতে বাঙালির ইতিহাস, শিল্প সংস্কৃতি, দিনে দিনে বেহাল দশায় পৌঁছে গেছে।একেক সময় একেক শাসকের আমলে নানান ঘাত-প্রতিঘাতের যাতাকলে পড়ে সংস্কৃতি বিকৃত রূপ লাভ করেছে।
২০১১সালের ১০ই মার্চ মা শেষ বিদায় নিলো।মৃত্যুর আগ মুহুর্ত অব্দি আমি আমার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছি,মায়াময় এক করুণ আর্তি।যেনো জলবিহীন এক ভাটার নদী,কপালের ভাঁজে ভাঁজে ছিলো এ জীবনে নারী হয়ে জন্মাবার কারণে অনেক কিছু না করতে পারার বেদনার এক সূক্ষ্ম প্রশ্ন।সেদিন তার বিদায় নেবার আগের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের ভাষা আমি বুঝেছিলাম।আমার সুখি হতে না পারার কথা, জীবনে একাই লড়ে যাবার কষ্টটা বারবার বুঝাতে চেয়েছেন।অবশেষে বাঁচার লড়াইয়ে এক পরাজিত সৈনিকের মতো মৃত্যুর কাছে করেছে আত্মসমর্পণ। কাতর প্রার্থনায় বাঁচার সাধে চোখদুটো ছলছল করছিলো। হয়তো ভেবেছিলেন আর কটাদিন থাকলে সন্তানদের সুখ দেখতে পারতেন।কতো যে শুভ্র সতেজ ছিলো আমার মা! কতোবার তাকে সূর্য হতে দেখেছি, বটগাছ হতে দেখেছি,বিস্তৃত মাঠ, খরস্রোতা নদী,আকাশের মতো বিশাল হতে দেখেছি,হতাশা
ব্যার্থতা, তৃষ্ণা,কাতরতায়, শ্রমে ঘামে, অপবাদে, অনাচারে জীবন্ত এই মাকে দেখেছি রোস্ট হতে।লোভী মহাজন সন্তানদের রক্ত চাবুকের রোষানলে, আমার ফুলের মতো লাবণ্যবতী মাকে ভাইদের স্ত্রীর বিষাক্ত দাঁতে বহুবার রক্তাক্ত হতে দেখেছি।মা ছিলেন বাবার সংসারের চাকা ঘুরাবার দিনমজুর,ঢেউ দোলানো স্বচ্ছ দিঘি,আলোকিত সংগ্রামী মহয়সী নারী, আর মায়ের চোখে আমি ছিলাম পূর্ণতিথির ঝলমলে জ্যোৎস্না।সেই মা আমার জীবনের এই একলা চলার দিনগুলো কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। স্বামী থেকে ও না থাকার মতো, দুটি প্রাণের ভরণ- পোষন যখন আমাকেই নিতে হয়েছে,এসব দেখে মা নিস্তেজ হয়ে যেতেন।এতো বড় দূণীয়ায় আমার একটু সুখ দেখে যেতে পারলেন না।
পাড়ার প্রায় সকলেই আমাকে চিনতেন, ভাল সম্পর্ক ও ছিলো অনেকের সাথে।ভাইদের বেশি কেউ চিনতো না। কারণ তারা পরিবার নিয়ে বেসকিছুদিন ধরে দেশের বাইরে ছিলেন। যখন এসেছে কয়েকজন চিনতো তাদের। ভাইয়েরা মায়ের মৃত্যু সংবাদ মসজিদের মাইকে বললে ও তেমন কেউ আসেনি।পরে আমার এক সহপাঠীকে আমার নাম দিয়ে বলতে বললে, সবাই বলে মসজিদে মেয়ে মানুষের নাম শুনলে বলবে না।দুঃখে আর একবার বললাম, কেনো মেয়ের নাম বললে কী হুজুরের মুখ বেঁকে যাবে?
পারিবারিক রাজনীতির স্বীকার আমি বারবার হয়েছি।স্বামীর পরিবারে ঠাঁই পাইনি, বাবার সংসারে ভাইয়ের বউদের চোখে আমি ভ্রষ্টা,একসাথে থাকলে তারা মায়ের প্রতি জুলুম করবে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই আমি একটা রুমের সংসার বানিয়েছি।এদিক থেকে কিছু ভাড়ার টাকা আর আমার ছোট চাকরি। স্বামী কোনদিন ঘরে ফেরেন,কোনদিন ফেরেন না।এ নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।
মাকে কবরে রাখতেই ভাইগুলো যেন মানুষ থেকে পশুতে রূপ নিলো,সাথে তাদের বউরা ও।সংসারে যা কিছু আছে লুটপাট করে দুজনে ভাগাভাগিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।আমি এদের সবাইকে এড়িয়ে গেলাম একপ্রকার। ওরা অনেক শিক্ষিত সার্টিফিকেট ধারী নৈতিক শিক্ষা-সংস্কৃতি বর্জিত।স্বামীভোগে হয় সুখী,অলংকারে ভারে হয় নর্তকী,নটেপনার আফিম খাইয়ে স্বামীকে করে বস।কোন কিছুর অভাব নেই, তবু্ও লোভীপনার শেষ নেই।লোভ আর নিচুতায় ওরা আবর্জনার বিষ্টায়ও ঘুমায়।
আমি আমার বাবা মায়ের আদর্শ নিয়েই বড় হয়েছি।সবদিকই আমার আলোকিত ছিলো, কিন্তু একটি ভুলের জন্য জীবনটা পচে গেলো।যে কারণে এদের সাথে কখনো তর্কে যাই না।আমি অধম নই,অবলা নই,মূর্খ ও নই।আমি থাকি আমার ভুলের সীমান্তে দাঁড়িয়ে। চাকরি পাওয়ার আগ মুহুর্ত অব্দি খুব টানা পোড়নে দিন চলছে। কারণ মা বাবার থেকে দূরে ছিলাম। তারাও আমাকে নিয়ে সামাজিকভাবে হেনস্তা কম হয়নি।নিজের বোধ থেকে দূরেই থাকতাম, যদিও পরে সব ঠিক হয়েছিলো। কতজনে দরদী হয়ে পাশে দাঁড়াতে চেয়েছে কিন্তু আমি প্রতিবারই ছিলাম মৌন্য,অনঢ়। মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকা ও তাকে শিক্ষিত করার দু'একটা অনুস্বপ্ন ছাড়া আর কোন চাহিদা কাম্য ছিলো না।শ্রমার্জিত অর্থেই ভাল থাকতে চেয়েছি বিলাসিত জীবনের ঊর্ধ্ব কামনায় কখনো লালায়িত স্বপ্নবাজ হয়নি।কষ্টে থেকে বাস্তবতা শিখেছি সুখের কৃতজ্ঞতায় শিখেছি আলু, ডাল দিয়ে ভাত খাবারের আনন্দ।কারণ আমার প্রবল আস্থা ছিলো;ভরসা ছিলো জীবনের কাছে।সৃষ্টির কারনে জীবনকে ভালোবেসে কিভাবে বেঁচে থাকা যায় তা চন্দ্রকে জন্ম দিয়ে বুঝতে পেরেছি।
দেয়াল চেটে চেটে তেলাপোকার মতো আমার জীবন লড়াই দেখে স্বজন মহল ও আপনজন কতোই না ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছে।আমার কষ্টের অংশীদার হতে চেয়েছে অনেকেই, মানেটা বুঝা সহজ ছিলো। তাদের অনেকেই আমার সৌন্দর্য ভোগের কামনায় লোভ দেখাতো অর্থের।বিনয়, কঠোরতায় এক সময় ছাড়তে হয়েছে সেই সব পরিচিত মুখের মঞ্চ।বিবেক ও বাস্তবতা এক সময় আমাকে দাঁড় করিয়েছে আত্মমর্যাদার মঞ্চে।কারো তিরষ্কার বা বাহাবার তিল- তোয়াক্কা না করে আমি আমাকে নির্মাণ করেছি কাঠ হাতুড়ির কঠিন পেরেক ঠুকে ঠুকে।পায়ের তলার মাটিকে নরম ভাবতে ভুলে গেছি অনেক আগেই।ভুলে গেছি লক্ষী নারীর পর্দানশীলতা,শোষক অফিসারের মিথ্যে প্রলোভন হাতের নরম আবেগী ছোঁয়া,ভুলে গেছি পদে পদে ঘাঁই খেয়ে অশ্রুচোখে ঘরে ফেরা।চোখের আকাশে শ্লোগান করে আমার হাজার জিজ্ঞাসা। তবে মাঝে মাঝে দিকহারা হয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠতাম।আমার তেজ দ্বীপ্ত কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসতো,নেতিয়ে পড়া লতার মতো আমিও ঢলে পড়তাম আত্ম বেদনায়।পরক্ষণেই আবার উঠে দাঁড়াতাম,নিজেকে কষ্টের স্রষ্টা বানিয়ে, জ্যামিতিক হিসেবে সময়কে গননা করে। বুঝতাম জীবনের সাথে নয়, জীবনকে ভালোবেসে সময়ের সাথে আমার যুদ্ধটা।কর্মের মূল্যবোধে অলিগলি, নর্দমা, সমাজ সভ্যতা একদিন আমায় ডাকবেই।যে নির্মান করতে জানে পরাজয় তার বেমানান এই সত্যটুকু জানি।
তবে আমারও কিছু চাওয়ার আছে,পাওয়ার আছে।অনেক চাওয়া!একফালি ভালোবাসার দাবীতে কয়েকবার হা-হুতাশ করে অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। সেই চাওয়া ছিলো স্বামির কাছে একটা সুখি সমৃদ্ধ গৃহকোনের।যখন তা হয়ে উঠলো না,তখন আমি আতাত করি শ্রমের সাথে, মেধার সাথে, মগজের ঘামের সাথে আর পিচঢালা পথের সাথে।যে পথ আমায় বাঁচার তাগিদে জীবন যুদ্ধে নামাতে শিখিয়েছে, যে তপ্তধূলিকণায় এ অফিস থেকে ও অফিসে একটা কাজের জন্য হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত আমি বহুবার মুখ থুবড়ে পড়ে আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছি।মনে পড়ে কোন এক নবজাতক সকাল থেকে বার্ধক্য সন্ধ্যাবধি কর্মের সন্ধানে ক্ষুদার্ত আমি একটি মসজিদের ট্যাপ থেকে পানি খেতে গিয়ে মুসল্লীদের রোষানলে পড়ি,শুধু নারী হবার কারণে তাদের এই রাগ।নিঃশব্দে বেরিয়ে এসেছি কোন উত্তর না দিয়ে।বিবেক ব্যক্তিসত্তা এতোটা সাহস দিতো যে,রাতের সোডিয়ামের ঝলমলে চোখে পতিতাদের বীভৎস জীবনের পরাজয় দেখে নিজের ভেতরে সততার শান্তনা পেয়েছি।তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত অফিসার ও স্বামীর পরিচিত বিত্তশালী লোকগুলো আমার রোদে পড়া ক্লান্তচোখে বহুবার চেষ্টা করেছে সবুজ আগাছা লাগাতে।তাদের অতিথিশালায় আপ্যায়নের মিথ্যা প্রমোদে অহেতুক নেচেছিলো নারীলোভী হায়েনাগুলো।আমি ঘৃণা ছুঁড়েছি ওদের কামুক দৃষ্টিতে লাথি মেরে।তবে আমার কাতরতর দীর্ঘশ্বাস, ক্ষয়ে যাওয়া পাঁজরের হাড়, ওই সব ভাল খাবারকে থেতলে দিয়ে কষ্টার্জিত আলুভর্তা ও ডালের গন্ধ আমায় মাতিয়েছে।
ঢাকার উচ্চবিত্ত সংসারে জন্ম,আশেপাশের হিন্দু মুসলিম মিলেই সবাই বসবাস করতো পাড়াটায়।বাবার হাত ধরেই বড়দিন,বৌদ্ধ পূর্ণিমা, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন উৎসবে গিয়েছি,তিনি ছিলেন প্রগতিশীল স্পষ্টবাদী তার্কিক ব্যক্তিত্ব।উচ্চ শিক্ষিত হওয়ায় মনের মাঝে কোন সংকীর্ণতা ছিলো না।ক্লাসে অন্য সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়ের সাথে ছিলো প্রচুর ভাব।আর সকল ধর্মের মানুষের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা এ আমার সতন্ত্র মানষিকতা।জীবনযুদ্ধে লড়ে যাওয়া দেখে আমার ভাইবোনেরা তিরষ্কার ও ঠাট্টা করে হাসি তামাসায় লুটিয়ে পড়তো।তারা তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও কটুক্তি করে মূর্খের মতো আত্মতৃপ্তি পায় আমাকে নিয়ে।কিন্তু আমি বিশ্বাস করি চন্ডিদাসের সেই সেরা উক্তি,"সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।" মানুষের মনের শালীনতা যদি নাই থাকে, বাইরের শালীনতার কি প্রয়োজন। তবে এটা ঠিক!হ্যাঁ ,পোশাক পরিচ্ছদ ও আচরণে শালীনতা নিশ্চয়ই প্রয়োজন।
২০১৭সালের ১২ই ডিসেম্বর প্রথম আলোয় একটি আপত্তিকর বৈরী সংবাদ ছাপা হয়েছিলো। যার শিরোনাম ছিলো "ফসলের মাঠে নারীদের যেতে মানা" ফসলের ক্ষতি ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে এই সিদ্ধান্ত। অথচ সামাজিক, রাস্ট্রীয়,অর্থনৈতিক কী পারিবারিক সবখানেই নারীর শ্রম ও বুদ্ধিমত্তার নিরালস অবদান রয়েছে।বাংলাদেশের কোন সেক্টোরে নারী নেই।সংসদীয় আসনে নারীরা আসীন। যে কারণে মৌল্যবাদীরা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে,ধর্মগ্রন্থ নারীকে সম্মান দিতে গিয়ে মাথায় তুলেছে।এসব বানোয়াট মিথ্যায় আমি অবাক হই। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,পুরুষ নারীর কর্তা আর নারী পুরুষের শস্য ক্ষেত্র।অপর দিকে হাদিস শরীফে বলা হয়েছে, "সতর্ক হও নারীজাতি থেকে,তারা শয়তানের রূপে আসে আর শয়তানের রূপে যায়।" প্লেটো বলেছেন,ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তিনি আমায় দাস না বানিয়ে, মুক্ত মানুষ বানিয়েছেন,আরো ধন্যবাদ তিনি নারী না বানিয়ে পুরুষ বানিয়েছেন।তবে ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা ছিলো বিরল।
মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে বর্ষাভাঙা প্রসূতি নদীর মতো আমিও একবেলা স্থীর বিশ্রাম নেই, খড়ের গাদার উপর হোগলাপাতার বিছানায় শুয়ে মেঘের হা- ডু- ডু খেলা দেখি।আর আমার চন্দ্রমল্লিকার শাপলাফোটা হাসি দেখি স্বপ্ন রাঙা চোখে।আবার সেই স্বপ্ন! আসলে স্বপ্নের কোন ভীত নেই,সে কেবল এক অনূভুতি, কামনা।প্রতিটি মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে স্বপ্ন শুধু উৎসাহদাতা আর নিজের এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাই হলো বাস্তবায়নের মূল উদ্যোক্তা।
ভেতরের প্রাচীন পিরামিড ভেঙে আমিও একদিন আবিষ্কার করেছিলাম একটি আহত স্বপ্নকে।যা ছিলো আমার কাছে হলদেরাঙা ঝলমলে সকালের মতো, গীরীচূড়ার সাঁই সাঁই বাতাসের শ্বেতডানায় ভর করে মেঘের উর্মিতে হামাগুড়ি দিয়ে নাচতো ঝুমুর-ঝুমুর কামরাঙা বর্ষায় বিজলির ঝিলিক এসে শিহরণ জাগাতো কদমের স্তন বোটায়।আমার অফুরন্ত সাধ ছিলো তাকে নিয়ে সীমাহীন আকাশ চষে বেড়ানোর,কৃষ্ণ সুন্দর মেঘের তানপুরায় গলা ছেড়ে আনন্দের গান গাইবার।আজও আমার সম্ভ্রান্ত স্বপ্নটি বন্দী পিরামিডে অপেক্ষার প্রহর গোনে।একদিন সেই আগের তুমি হয়ে ফিরে আসবে এই জীবনের আঙিনায়।
তবে ভালোবাসা শব্দটি আমার কাছে নষ্ট মুখের ঘৃণার লালার মতো।ছলনাময়ী এই ভালোবাসা মানুষকে শুধু আক্রান্ত করে। আমার জীবনের মহাপুরুষটি ভালোবাসার নামে শাসনে শোষণে শুধু নিষ্পেষিত করতে পছন্দ করে প্রান্তে-প্রহরে, প্রশ্নে-প্রতিউত্তরে, ভাবনায় বাস্তবতায় আমাকে পিষে মারতেই তার বেশি আনন্দ।কৌশলী চোখদুটো আমার সকল পাওয়া না পাওয়ার ইচ্ছেকে শেকলে বেঁধে কামনা ভোগই তার আসল উদ্দেশ্য ছিলো।কী দোষ ছিলো আমার?শুধু চন্দ্রর পরিচয় চেয়েছি,আর সে চেয়েছে গর্ভের ভ্রুণটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে।আগে ক্যারিয়ার এরপর সব। আমি হারতে চাইনি,আমার ভ্রূণটি আত্মপ্রকাশ করুক পিতার নামে, এই চাওয়াই হলো আমার কাল।বদমেজাজি প্রেমিক পরিবারের চাপে বিয়ে ঠিকই করলো, কিন্তু সংসার আর হলো না আমার তার সাথে।লোলুপ দৃষ্টি ছিলো তার বাইরের নারীর প্রতি।সেভাবেই খুব ভাল ছিলো সে।
তবে আমি আমাতে স্থীর ছিলাম, আমার মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে।মেয়ের আস্থা যুগল চাহনি, কর্ম,নিষ্ঠা,ব্যক্তিসত্বা আমায় শক্তি দেয়।আমি পদবী পেয়ে পেয়ে উপরের আসন গ্রহন করি আর আমার চন্দ্রমল্লিকা পড়ালেখায় মেধাবি হওয়ায় তরতর করে এগিয়ে যেতে থাকে।আমাদের প্রতিভার প্রজ্জ্বলিত আলো দেখে বিষাক্ত পতঙ্গের মতো পুড়তে থাকে কাছের আপনজন।চিন্তা করি থাক! ওরা সবাই যার যার মতো, কিন্তু আমার ভেতরের আমি, যৌক্তিক মৌলিক তাড়নায় তুমুল প্রতিবাদ করে ওঠে।ওদের ক্ষমা করো না কাউকেই।
এখন আমি তৃপ্তিতে অলিন্দে আকাশ ছুঁয়ে দেখি, স্বপ্নের মতো জীবন উপভোগ করি।আমার নিষ্ঠা, কর্মের সততা ও ধৈর্য নতুন পথ এঁকে দিয়েছে, সেখানে আমিও আমার চন্দ্রমল্লিকা রানী।
ঘড়িতে রাত তিনটা বিশ মিনিট। ব্যালকোনির কার্ণিশে দাঁড়িয়ে খুব দেখতে ইচ্ছে হলো তোমায়। মদ খেয়ে তুমি অঘোরে ঘুমাচ্ছ বালিশ নেই মাথার নিচে, শরীরের সেই সৌন্দর্য, সেই সুঠাম দেহ, কিছুই আর নেই।নারী আর খারাপ সঙ্গ তোমায় শেষ করে দিয়েছে।তবু্ও জানতে ইচ্ছে করে তুমি কেমন আছো?এতোটা বছর একদিনও না সে, না আমি প্রণয়মাখা সুরে কথা বলেছি।যেটুকু না বললে নয় শুধু তাই হয়েছে, তাও চন্দ্রর জন্য।বুকের ভেতর দুই পাশের পাঁজর ভাঙে পেছনের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভেবে।আমি নিঃশব্দে ঘরে এসে টেবিলে বসি, পুরানো ডাইরির পাতা উল্টে দিনপঞ্জি লিখতে, আমার প্রতারক স্বামী নামের প্রিয়তমকে।সাদা কাগজের বুক ভেদ করে কলম ছুটে চলে খরস্রোতা নদীর মতো-----আমি আর একবার তাকে লিখলাম--
রাত গভীর, সবাই ঘুমাচ্ছে, শুধু একা আমি নির্ঘুম রাতে তোমাকে লিখছি।জানি না,আজকাল তুমি কেমন থাকো।এখনো কি আগের মতো রাত জেগে মুঠোফোনে নষ্ট প্রেমের জোয়ারে ভাসো?এখনো কি বাইরে থেকে মদ খেয়ে ঘরে ফেরো?আজও কি বিকৃত মস্তিষ্ক নগ্ন সভ্যতায় নাচে? এখনো কি ঘৃণিত শিল্পকলায় সাহিত্য ও শিল্পীর কোন লোক না হয়েও লাঙ্গল চালাও তোমার অগণিত নন্দিতাদের পতিত জমিতে?জয় হোক তোমার বুনো আদিমতার, জয় হোক তোমার কামাতুর বেলিল্লাহপনার,জয় হোক অসুস্থ রুচিবোধের,জয় হোক কালোত্তীর্ণ ভণ্ডামির।
তোমাকে না বুঝতে পারা, তোমার প্রেমকে বিশ্বাস করা এ আমার অপরাধ নয়, ছিলো অজ্ঞতা।সেই স্বীকারোক্তি আমি দিয়েছি বারবার বিবেকের কাছে।আর তোমার সাথে আমার ব্যাবধান বা দুরত্ব এ ছিলো আমার স্বচ্ছ মানষিকতার এক সঠিক সিদ্ধান্ত। আমার কৈফত শুধু সমাজের কাছে নয়।কারণ দুধের মাছি সমাজ নির্মাতাদের আমার ঢের ঢের জানা আছে।তুমিও তোমাদের সমাজ বহুরূপী গিরগিটি। আমি এতো রূপ বদলাতে পারি না,দিনের সৌর আলোককে অমাবস্যা ভাবতে পারি না।আমি মাঠকে নদী আর মাছকে গাছ বলি না।আমার বিবেক আমায় সুস্থজ্ঞানে সত্য বলতে শিখিয়েছে।একদিন বোকা বধিরের মতো মেয়ের অধিকারের কথা ভেবে সামাজিক ও ধর্মীয় দায় এড়াতে কাবিননামায় সই করেছিলাম।তোমার প্রথাগত অনাচারে আমি হয়েছিলাম হিংস্র হায়েনার কামুক সুস্বাদু খাবার।আমি প্রতিদিন মুক্তির কামনায়, নিজের শক্তির উপর দাঁড়াতে না পারায় শীতল মৃত্যুর কাছে আশ্রয় খুঁজতাম।তোমার ব্যাভিচারে আমার হৃদপিণ্ড চুইয়ে রক্ত ঝরতো।গো শালার পশুর মতো নীরব থেকেছি,তবুও তুমি, তোমার পরিবার, আমার আপনজন সবাই বাজে কথায় রক্তাক্ত ফাঁসির মঞ্চে ঝুলাতো হিংস্র জল্লাদের মতো প্রতিদিন ।
আমি চাইলে সব উত্তর দিতে পারতাম, দেইনি আমার শক্তি ও ইচ্ছার কাছে হেরে যাবার ভয়ে।তাই চাবুকের ক্ষত ঠোঁট দুটিতে প্রতিবাদ না করে তালা ঝুলিয়েছিলাম,পায়ে পরেছিলাম লজ্জা নুপুর।তবুও চৌকাঠে স্বামী নামধারী শোষকের মতো স্ত্রীর মালিকানা দাবীতে ভিটে কাঁপানো চিৎকার দেই নি কখনো ।আমি জানি, এই অসভ্য সমাজ ও চতুর ঠকবাজদের হাত থেকে আমার মুক্তি নেই।কারণ তোমরা পুরুষ আমরা নারী।তোমাদের সব আছে,আছে নিয়ম করা ও কেনার ক্ষমতা।স্ত্রীকে প্রহারের অধিকার, বেশ্যালয়ে যাবার অধিকার, আর অপরাধ করে ও অন্যকে হয়রানির ক্ষমতা।তুমি পুরুষ নামের দেবতা,অলিতে-গলিতে, হাটে-বাজারে, নারীর সুখ চষে বেড়ানো ও নারীদের
লাঞ্চিত করার শক্তি আছে।আইন-নীতি-শোষন, হিংস্রতা, অনাচার,ধর্ম-বর্ণ-অবিচার-প্রতিশোধ, দাম্ভিকতা,উগ্রতা,মিথ্যাচার,রক্ষিতা,ভোগ,লিঙ্গ - লোলুপতা, নারীর দেহ,কামনা যোনী সবই তো পুরুষের, কারণ তোমরা স্বামী নামের দেবতা,আমাদের সন্তানদের পিতা,ভরণপোষণের মালিক।এতোগুলা গুণের পুরুষ- বেশ্যা হওয়ার পরও তুমি পুরুষ, আর আমি অবলা নারী।
বলতে পারো? ধর্ম আর সামাজিক দায়বদ্ধতার কাছে আমি আর কতোবার নারী হবো?আর কতোটা রক্ত ঝরালে শুদ্ধি সমাজে নারীর বৈরীতা থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ হবো?তথাকথিত সমাজ ও ধর্ম নির্মাতাদের বৈষম্যের দৃষ্টিতে ঘরে-বাইরে,হাটে বাজারে,আচারে মজলিসে,চিন্তা -চেতনায়,শুদ্ধতায়,বিবেচনায় কবে আমি বা আমরা নারী হবো?
তোমরা নারীকে শুধু ভোগের পণ্য না ভেবে যদি মানুষ ভাবতে, তাহলে নারী এই বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারতো।পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজব্যবস্থায় একজন নারী কেবলই নারী।পুরুষের চোখে সে কেবল নমনীয়, মোহনীয়।পুরুষের উদগ্র লালসায় এখনো সে লোভনীয় উপচার।সে যেনো এই পৃথিবীর, মাটির কেউ নয়।যে কারণে ইন্দ্রীয় স্বার্থকে চরিতার্থ করার জন্য নারীকে বেছে নেয় শাসিত সমাজ।পুরুষের এই মানষিকতার গায়ে চুনকাম এঁটে দেয় ধর্মব্যবসায়ীদের মুখ থেকে নিঃসৃত কিছু বাণী।যার সার কথা নারীর কর্তব্য হলো পুরুষকে আনন্দ দেওয়া,সেবা করা,আর বংশ বিস্তারে সহয়তা করা।তোমরা মনে করো নারী হলো জেনানা। এই ভাবে অন্ধ জালের ভেতর থেকে কবে নারীকে মুক্তি দেবে সম অধিকারে বলবে একবার, তোমরা পিছিয়ে নেই দাঁড়াও আমাদের পাশে?
শৈশবে পিতা,যৌবনে স্বামী,এবং বার্ধক্যে পুত্রের পরাধীন নারী।যিনি জন্মদিয়েছেন,যাকে জন্ম দিয়েছেন, এবং যার সহযোগিতায় জন্ম দিয়েছেন,এরা প্রত্যেকেই শাসন ও শোষণ করেছে নারীকে।যেকারণে এতো বৈরিতার স্বীকার নারী।বলতে পারো আর কতোবার ধর্ষিত হলে একজন মা নারীর মর্যাদা পাবে?
❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️

0 Comments