সুযোগের অপেক্ষায়
পর্ব:০১
তাজরীন খন্দকার
বিয়ের ঠিক তিনদিন আগে শুনলাম, আমার হবু স্বামী নাকি আমার প্রাক্তনের বড় ভাই!
কথাটা আমার কাছে ঠিক অষ্টম আশ্চর্যের মতো! বিয়ের কথাবার্তা চলাকালীন শুনেছিলাম তারা দুই ভাই দুই বোন।
যেটা আমার প্রাক্তনের পরিবারের মতোই কিন্তু সেটা যে তারই পরিবার সেটা জানার কোনো সুযোগ ছিলো না।
কারণ বিয়ের সম্পর্কে কোনো কথা শুনতে বিশেষত মেয়েরা লজ্জাবোধ করে,আমার ক্ষেত্রেও তাই!
আর পরিবারের ইচ্ছেতে যেহেতু বিয়ে করবো সেখানে এতকিছু জানারও দরকার মনে হয়নি।
তারপরও যদি রিহান, মানে আমার প্রাক্তন এখানে আসতো তাহলে হয়তো বিয়েটা এতটুকু আগাতো না!
আজকে হুট করেই আমার হবু বর পরাণ আমাকে বললো তার ভাই রিহান নাকি চাকরির অসুবিধায় বিয়েতে উপস্থিত হতে পারবেনা।
পরাণের সাথে বিয়ের তারিখ হওয়ার পরে একটু একটু কথা বলি,যদিও আমি বলতে চাইনি কিন্তু আমার পরিবারই সেটা করতে বাধ্য করেছে। কথা বললে নাকি দুজনের প্রতি একটা চেনাজানা হবে!
কিন্তু মাত্র তিনদিন আগে আমি পরাণের মুখে রিহানের কথা শুনে অনেকটাই হতবিহ্বল! এরপরও সেটা সিউর ছিলাম না। অজান্তেই জিজ্ঞাসা করে ফেললাম আপনার ডাক নাম কি তকী?
পরাণ আমার কথায় অবাক হয়েছিল বেশ, কারণ তার ডাক নাম আমি কিভাবে জানলাম সেটা বুঝতে পারছিলো না।
পরে তো জিজ্ঞাসাই করে ফেললো..
--- তুমি আমাকে আগে থেকে চিনতে নাকি?আর
হ্যাঁ আমার ডাক নাম তকী কিন্তু সেটা শুধু আমার ঘরের মানুষ ডাকে। এছাড়া বাইরে আমি পরাণ নামেই পরিচিত,কারণ সেটা সার্টিফিকেট নেইম, স্কুল কলেজ সবখানে তাই পরাণ নামটাই সবার জানা। তুমি কিভাবে জানো বলো?
আমি পরাণের কথার জবাবটা ইগনোর করলাম। কিছুই বললাম না কিভাবে জানি!কারণ আমি রিহানের মুখে তার ভাইয়ের অনেক কথা শুনেছি তকী ভাই এটা! তকী ভাই সেটা মানে খুউউব প্রশংসা তকী ভাইয়ের!
পরাণের ফোন কেটেই আমি বড় ভাবীর কাছে গেলাম,বিষয়টা জানানো দরকার!
শত হোক প্রাক্তনের বড় ভাইয়ের সাথে বিয়েটা মানা যায়না। হয়তো রিহান কিছু জানেনা এখনো, জানলে নিশ্চিত বিয়ে ভেঙে যেতো। আর বিয়ের পর জানলেও অশান্তি হবে ঠিকই। কারণ রিহানের সাথে সম্পর্ক ছিলো শুনলে সাংসারিক জীবনেও পরাণের সাথে আমি সুখী হবো না। আর এক ঘরে সেটা জানার বাকি থাকবে না সেটা বুঝতে পারছিলাম।
বড় ভাবীর কাছে গিয়ে কতক্ষণ ঘুরঘুর করলাম। কিন্তু ভাবী আমার প্রবাসী ভাইয়ের সাথে কথা বলছে। আমার জীবনের একমাত্র তথ্য একাউন্ট হলো ভাবী! উনার কাছে বলিনা এমন কোনো কথা নেই। রিহানের সাথে সম্পর্কটাও ভাবীর অজানা নয়।
এক ঘন্টা পরে ভাবীর কাছে গেলাম। গিয়ে কাচুমাচু করছিলাম।
ভাবী নিজেই বললেন..
--- কিগো এমন শুকনো লাগছে কেন মুখটা? কোনো সমস্যা হলো নাতো?
--- আসলে ভাবী বিয়েটা করলে আমার খুব সমস্যা হবে। কোনো উপায় কি এখন নাই বিয়ে ভাঙ্গার?
ভাবী আমার কথায় চোখ কপালে তুলে ফেললেন।
--- বলো কি? তারিখ হওয়ার পরে বিয়ে ভাঙ্গা! তওবা তওবা এই কথা মুখেও এনো না মেয়ে! আর আমার জানামতে তো তোমার কারো সাথে প্রেমও নেই।
আমি চুপ করে রইলাম! ভাবী আমার কাছে এসে গালে হাত দিয়ে ব্যঙ্গ করে বললো..
-- সেই যে রিহাইন্না বাচ্চা আমার আদুরে ননদীটাকে ছেড়ে গেলো এরপর তো শুনিই না তার মুখে ভালোবাসার কোনো কথা!
--- ভাবী থামো! সব সমস্যা তো ওই রিহানই!
--- সব সমস্যা রিহান মানে? সে কি আবার ব্যাক করেছে তোমার জীবনে?
--- আরে নাহ! সে আসে নাই আমিই তার বাড়িতে যাচ্ছি কয়েকদিন পর!
ভাবী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে!
তারপর আমি ভাবীকে সব খোলে বললাম! কার সাথে যে শেষ পর্যন্ত আমার বিয়ে ঠিক হলো!
সব শুনে ভাবী কোথায় চিন্তা করবে ভেবেছিলাম, সেখানে উনি হাসছেন একনাগাড়ে! .
আমি সিরিয়াস হয়ে আবারো বললাম.
--- ভাবী প্লিজ! বিয়েটা আমি এখানে কোনোভাবেই করব না। তুমি আমাকে সাহায্য করো প্লিজ!
--- তাজ তুমি রিলেক্স হও! এখন কোনোভাবেই বিয়ে ভাঙা সম্ভব নয়! এতে আমাদের মানসম্মান জড়িত!
তবে আসল কথা হলো আমার খুব মজা হচ্ছে তুমি রিহানের বড় ভাইয়ের বউ হবে!
--- মজা হচ্ছে মানে কি ভাবী? তুমি জানো এর পরিণতি কি হতে পারে?
---- পরিণতি ভেবেই তো আমার মজা হচ্ছে! প্রাক্তনের ভাবী হবা,চোখের সামনে তোমাদের প্রেম দেখে সে হিংসায় জ্বলতে থাকবে! সে তোমাকে খুউউব কাঁদিয়েছে তাজ! প্রতিশোধ নিবার সুযোগ এটা!
আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম! সত্যিই তো রিহান আমাকে স্বপ্ন দেখিয়ে চোখের সামনে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে প্রেম করে বেড়িয়েছে। কোনো একটা অজানা কারণে আজ পর্যন্ত সে আমার সাথে কথা বলেনা৷ এমনকি ফোনেও ধরেনা কখনো। ছেড়ে যায়নি শুধু কলিজা ছিড়ে ফেলেছে এই রিহান৷ তার প্রতি আমার অনেক ক্ষোভ জমে আছে,কিন্তু মেয়েদের রাগ থাকতে নেই কারো প্রতি। তাই ঝেড়ে ফেলেছিলাম সবকিছু। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে প্রতিশোধ নেওয়ার একটা চান্স পাবো!
ভাবীর কাছ থেকে গিয়ে ফোন দিলাম পরাণকে। এখন একটু আবেগ নিয়ে কথা বলতে শুরু করলাম। এতদিন উনি দশটা কথা বললে আমি একটা জবাব দিতাম৷ কিন্তু আজকে নিজে থেকেই প্রচুর কথা জুড়ে দিলাম। এমন ভাব করলাম যেন কয়েকদিনে উনাকে প্রচুর পরিমাণে ভালোবেসে ফেলেছি আমি!
পরাণও বিয়ের আগে কয়েকদিনেই আমাকে খুব ভালবেসে ফেলে!
শেষ পর্যন্ত আমাদের বিয়েটা হয়ে গেলো ছোট আয়োজনের মধ্য দিয়ে। পরিবারের সবাই উপস্থিত শুধু রিহান ছুটি পায়নি। সে পরের মাসে আসবে শুনলাম। আসুক যখন ইচ্ছে!
তারপর আমাকে যখন পরাণের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো, তার একটু পরেই রিহান ভিডিও কল দিলো।
কে জানি বলতেছে রিহান তার ভাবীকে দেখতে চায়!
কথাটা শুনেই আমার কেমন দম আটকে আসছে!
আমাকে চিনতে পেরে যদি এতো মানুষের সামনে রিহান উল্টা পাল্টা কিছু বলে বসে? তখন কি হবে?
তারপর এখানে আমার পুরো ভবিষ্যত নির্ভর করছে। আজকে অন্তত আমি তাকে দেখা দিতে পারবোনা।
তখনই পরাণ ফোন নিয়ে আমার সামনে বসলো,ফোনে বলতেছে এই দেখ তোর ভাবী!
ওপাশ থেকে আওয়াজ আসছে..মুখ দেখা যাচ্ছেনা কেনো ভাই?
তখনই পাশে থাকা একজন আমার ঘোমটা তোলে থুতনিতে ধরে মুখটা উপরে উঠানোর চেষ্টা করলো। শত হোক জোর তো করা যাবেনা। তখনই ফোনের ওপাশ থেকে শুনতে পেলাম...
চলবে...

0 Comments