সুযোগের অপেক্ষায়
পর্বঃ ০২
তাজরীন খন্দকার
তখনই পাশে থাকা একজন আমার ঘোমটা তোলে থুতনিতে ধরে মুখটা উপরে উঠানোর চেষ্টা করলো। শত হোক জোর তো করা যাবেনা। তখনই ফোনের ওপাশ থেকে শুনতে পেলাম...
রিহান বলছে..
--- তকী ভাই,এটা কি বউ নাকি আটার পুতুল??
চেহেরা তো কিচ্ছু বুঝা যাচ্ছে না!
রিহানের এমন কথায় পরাণ জোরে হেসে উঠলো! ফোনটা আমার সামনে থেকে নিয়ে পরাণ বললো..
--- আজ না,পরে দেখিস বুঝলি?
পরাণের কথাটা শুনার পরে এতক্ষণে যেন আমার বুকের ধুরমুরিটা একটু কম অনূভব করলাম। ভয়ে জিহ্বা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছিলো! যাক আজকে রিহান আমাকে চিনতে পারেনি। না হলে বাড়ি ভর্তি শশুড় বাড়ির লোকেদের সামনে কতো বড় বিপদে জানি পড়তে হতো !
এরপর আবার মনে হচ্ছে আজকের বিপদ কেটে গেলেই কি? ভবিষ্যতের সবকিছু তো রয়ে গেছে! এর পরিণতি কি হতে পারে ভেবেই আমার সারা শরীর ঘেমে একাকার!
এর সবকিছুর পেছনে দোষ আমার ভাবীর! তিনিই আমাকে উল্টো বুদ্ধি দিয়ে আস্বস্ত করেছে। না হলে এই বিয়েটা কখনোই আমি করতে চাইতাম না৷ দরকার হলে বিয়ের আগের দিন পালিয়ে যেতাম!
এই কথাটা ভাবতেই আবার আমার মনে হলো কার সাথে পালিয়ে যেতাম? আমার তো বয়ফ্রেন্ডই নাই, কি পোড়া কপালরে!
এর মধ্যে আমার ঘোর কাটলো! ধুর বিপদের মধ্যে কি জানি কি সব ভাবতে শুরু করে দিয়েছি! সত্যিই ভাবনা জিনিসটা মারাত্মক। কোথা থেকে জানি কোথা পৌঁছে যাই হুশ জ্ঞান থাকেনা!
তবে পরাণ খুব ভালো! সেটা অল্প সময়ের ব্যবধানেই বুঝতে আমার সমস্যা হয়নি। লজ্জা পেলেও সত্য বলে ফেলি, আমি পরাণকে একত্তু একত্তু করে ভালোবাসি ফালাইছি!
অতঃপর আমার মনে হলো যা হবার হবে, এতো ভেবে কাজ নেই। সময়ে সব দেখা যাবে! এটা যদিও মনকে শান্তনা দেওয়ার জন্য ছিল কিন্তু ভেতরে কেমন জানি একটা আকস্মিক ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম।
সারাদিনের ক্লান্তির পরে যখন পরাণের রুমে গেলাম! তখন নিজেকে একমাসের নির্ঘুম প্রাণী বলে অনুধাবন করতে পারলাম।কিন্তু বেচারি পরাণ রুমে এসে প্রায় ২০ মিনিট একদম নিশ্চুপ হয়ে ফ্লোরে বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে । এদিকে আমি তীব্র ঘুমে ঘোমটার নিচেই বসে ঝিমাচ্ছি! একটু পর পর নুয়ে যাচ্ছি আবার সোজা হতে চাচ্ছি!
ঘুমে অস্থির প্রায় অবস্থা, হঠাৎই কিভাবে জানি বুঝতে পারলাম পরাণ আমার পাশে বসা!
এভাবে আসাতে হুট করে প্রচন্ড রকম ভয় পেয়ে গেলাম। একটু নড়েচড়ে বসলাম, আর পরাণ শব্দ করে হাসতে হাসতে বলে উঠলো..
--- তাজ, তুমি কি এতক্ষণ জিকির করছিলে?
--- কি সব বলছেন আমি কখন জিকির করলাম?
---- হাহাহাহা আধ ঘন্টা ধরে দেখে যাচ্ছি মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ফকিরী টাইপ জিকির করছিলে! আমি ভাবলাম ধ্যানে আছো তাই বিরক্ত করিনি!
পরাণ এটা বলেই হাসতে শুরু করলো!
পরাণের এমন অদ্ভুত কথা শুনে লজ্জা পেলাম খুব আবার হাসিও পাচ্ছে। আমি ঝিমাচ্ছিলাম সেটাকে এতক্ষণ সে তাহলে ফলো করেছে।
এদিকে সরাসরি পরাণের দিকে চোখ তোলে তাকাতে বুকের ভেতর কেমন জানি একটা ভয়াবহতা সৃষ্টি হচ্ছে। এমনকি কথা বলার সাহসও হারিয়ে ফেলেছি মনে হচ্ছে,
কোনো কথারই জবাব দিচ্ছিনা। হয়তো পরাণ তখন আমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরেছে! তা-ই বালিশটা এগিয়ে বললো
--- তাজ!ঘুমাও তুমি।
আমিও ঘুমিয়ে যেতে চাইলাম। চোখ লেগে যাবে সেই মূহুর্তে শুনলাম..
--- বিয়ের আগে তুমি কাউকে ভালোবাসতে তাজ?
পরাণের কথায় কলিজা আবারো মুচড়িয়ে উঠলো৷ ঝট করে চোখ খোলে নিজেকে কিছুটা শান্ত দেখানোর অভিনয় করে বললাম
.. না তোহ! কাউকে ভালোবাসিনি। এই কথা কেন?
কেউ তাকিয়ে থাকা অবস্থায় মিথ্যা কথা বললে কেমন জানি চোখ মিটমিট করে,আর বারবার ঢুক গিলতে ইচ্ছে হয়। মিথ্যা কথাটা বলার পর মনে হলো এটা বলা আসলে উচিত হয়নি। কেমন জানি নিজের কাছে খারাপ লাগছে! রিলেশনে কম বেশি অধিকাংশ মেয়েই জড়ায়৷ কিন্তু খুব কম মেয়েই আছে যারা কিনা জামাইকে এই সত্যি কথাটা বলার সাহস পায়! কারণ তারা বিয়ের পরে অতীত ভুলে নতুন করে বাঁচতে শিখে নেয়,তাই আগের কিছু বলে নতুন জীবনে অশান্তি আনতে চায়না।
কিন্তু সবার মতো তো আমার সত্যিটা চাপা থাকবে না। আচ্ছা আমার কি পরাণকে সবকিছু বলা উচিত আজই? কিন্তু নাহহ সাহস পাচ্ছিনা৷ একটা দুটানাতে পড়ে গেলাম। চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান ধরেই এসব ভাবছি৷ কখন যে ঘুমালাম আর সকাল হলো সেটা পরাণের ডাক না শুনলে বুঝতাম না।
হুড়মুড় করে উঠে ফ্রেশ হলাম। বাথরুম থেকে বের হতেই শুনি পরাণ আবারো রিহানের সাথে ভিডিও কলে কথা বলছে,আমাকে দেখেই বলে উঠলো..
--- তোর ভাবী এসেছে। নে এখন দেখ!
আমি চমকে উঠলাম। হাতের তোয়ালে দিয়েই মুখ ঢেকে পাশের চেয়ারে বসে পড়লাম।
পরাণ আমাকে আচরণে অবাক হলো। সে মুখ খোলতে বারবার রিকুয়েষ্ট করছে। কিন্তু আমি জিদ ধরে বসে আছি। অপর পাশে রিহান কি জানি বলছে আর হাসছে! আমি বাধ্য হয়ে পরাণের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ফোন কেটে কানের কাছে ফিসফিস করে বললাম..
--- এভাবে হঠাৎ করে বউকে দেখায় কেউ? আমার লজ্জা লাগে না বুঝি?
পরাণ চোখ বড় করে ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে..
--- এএ লজ্জা লাগে আমার বউয়ের!আচ্ছা যাও এভাবে আর দেখাবো না।
বলেই পরাণ ফোন টিপতে টিপতে বাইরে চলে গেলো। সেদিনটা এভাবেই মেহমান আর নরমাল আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে চলে গেলো।
এরপর আর রিহানের ভিডিও কল নিয়ে পরাণ আমার কাছে আসেনি। তবে এমনিতে ভয়েজ কলে কথা বলতে প্রায়ই বলে কিন্তু আমি বলিনা,, পরাণকে বুঝালাম যেদিন বাস্তবে দেখা হবে সেদিন একসাথে দেখা এবং কথা বলা হবে!
কারণ আমি জানি রিহান আমাকে কণ্ঠ শুনলেই চিনে ফেলবে!
এরপর আমাদের দুজনের একসাথে ঘুরতে যাওয়া কিংবা আমার বাবার বাড়িতে আসা যাওয়া আর আমাদের সাংসারিক জীবন স্বাভাবিক চলছে।
এর মধ্যে আমাকে কয়েকদিনের জন্য পরাণ আমাদের বাড়িতে রেখে আসলো।
বাড়িতে ৩ দিন থাকার পরে আমার শাশুড়ী ফোন দিয়ে বললো..
--- তাজ,তুমি রেডি থেকো। আজকে তোমাদের বাড়িতে পরাণের সাথে আরেকজন মেহমান যাবে৷
প্রথমত আমি বিরক্ত হলাম,আসতে না আসতেই চলে যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
আবার পরাণকে দেখতেও ইচ্ছে করছে, যদিও প্রতিদিন নিয়ম করে আমাদের দুজনের কথা বলা থেমে নেই! পরাণকে বিয়ের আগেই একত্তু ভালোবাসি ফালাইছি বলেছিলাম আর এখন তো একদম পুরোপুরি তার উপরে আমার নির্ভরতা! খুব ভালোবাসি আমি এখন পরাণকে! রিহানের কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম।
পরাণ আসবে শুনে তার পছন্দের কালো শাড়ী পরে এবং সাথে হালকা সেজেগুজে বসে আছি। তিনদিন ধরে তারে দেখিনা মনে হচ্ছে যেন তিন বছর!
অনেক্ষণ অপেক্ষার পরে বিকাল ৪ টার সময় কলিং বেলের আওয়াজে দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলে দিলাম।
দরজা খোলার পরেই আমার শ্বাস আটকে যাওয়ার অবস্থা। আমার সামনে রিহান একটা লাল রঙে মুড়ানো বক্স নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে ছিলো! আমাকে দেখেই তার মুখে একটা ভয়ানক অন্ধকার নেমে এলো।
কিছু বলতে গিয়েও পারলো না,কারণ তখনি পেছন থেকে পরাণ বললো..
--- দরজায় দাঁড়িয়ে ভাবীকে দেখতে হবে না, ভেতরে গিয়ে দেখিস!
আমি সরে দাড়ালাম। আর এরা ভেতরে গেলো। আমি এখান থেকে রান্নাঘরে যেতেই ভাবী আমার হাতে শরবতের গ্লাস ধরিয়ে দিলো তাদেরকে দেওয়ার জন্য! সাথে কতক্ষণ আজাইরা বুদ্ধি শিখায় দিলো। কিন্তু শরবত নিয়ে যাওয়ার সময় আমার হাত কাঁপছে অনূভব করলাম। ভাবীর এসব কথা আমার কানে পৌঁছায়নি।
সেখানে গিয়ে আমি রিহানের দিকে না তাকিয়ে গ্লাস দুটো রেখে চলে আসবো তখনি পরাণ বলে..
---- যাও কই? এতদিন তো খুউউব বললে বাস্তবে দেখা হলে আমার ভাইয়ের সাথে অনেক কথা বলবে!
এখন তো কেমন আছে সেটাই জিজ্ঞাসা করলে না। আমাকেও না৷
তখন আমার মনে হলো সত্যিই তো,আমি তাদেরকে কিছুই বলিনি৷ আমি পরাণের দিকে তাকিয়ে বললাম..
--- আপনাকে পরে জিজ্ঞাসা করবো, আগে উনাকে জিজ্ঞাসা করি!
তো রিহান ভাইয়া বলেন কেমন আছেন?
রিহান এতক্ষণ ধরে একটা কেমন যেন একটা চিন্তায় ডুবে ছিলো। আমার মুখে ভাইয়া শুনে সে ভ্রু বাঁকা করে তাকিয়ে আস্তে করে জবাব দিলো..
--- জ্বী আমি ভালো!
আবারো তিনজনের মধ্যে নিরবতা।
একটু পরে আমি আস্তে করে বারান্দায় গেলাম উত্তর পাশের দরজা দিয়ে।
ঠিক তখনি দেখি রিহান আমাকে ফলো করে দক্ষিণের দরজা দিয়ে বারান্দায় আসার চেষ্টা করছে। ওইদিকে পরাণ সোফায়ই বসে আছে। রিহান দরজায় দাঁড়িয়ে আমার নাম ধরে ডেকে অন্য কিছু বলতে যাবে, আমি তখনি সেখান থেকে বেড়িয়ে পরাণকে ডাকতে লাগলাম..
---- এই এই দেখেন তো আমার কানের দুলে চুল আটকে গেছে।
পরাণ দেখলো এদিকে কেউ নেই আর রিহানও নেই,তাই সে এগিয়ে সেটা খোলে দেওয়ার চেষ্টা করলো। যদিও সেটা আমি ইচ্ছে করেই তখন পেঁচ লাগাইছিলাম। রিহানের সাথে কথা না বলার জন্য! তখন আমি আর পরাণ খুব কাছাকাছি সেসময় রিহান এদিকে আসতেই আমাদের দুজনকে এভাবে দেখে আবার পিছিয়ে গেলো৷
সেটা দেখে আমার খুব হাসি পেলো। এরপর রিহান একা একাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে৷
একটু পরে ভাবী এসে বলে গেলো তোমারা ছাদে গিয়ে বসো সেখানে প্রাকৃতিক বাতাসটা দারুণ উপভোগ করবে এখন।
আমিও তিনটা চেয়ার নিয়ে ছাদে উঠে গেলাম। কারণ জানি ভাইকে নিয়েই এখানে আসবে পরাণ। চেয়ার তিনটা রেখে পেছনে তাকাতেই আমি ভয় পেয়ে গেলাম। রিহান একা দাঁড়িয়ে আছে, পরাণ নেই।
রিহান গম্ভীর সুরে বলল..
--- এই মেয়ে তুমি আমার ভাবী সেটা কিভাবে সম্ভব? বিয়ের দিনের সাজগোছ পূর্ণ ছবির কথা বাদ দিলাম কিন্তু আমি তো বিয়ের আগেই তোমার ছবি দেখেছি কিন্তু সেখানে তো চেনা যায়নি৷ এখন তুমি আমার ভাবী মানতে পারছিনা কোনোভাবেই আমার বড় ভাইয়ের বউ আমার এক্স গার্লফ্রেন্ড, আল্লাহ!
আমি রসিকতার সুরে বললাম..
--- কেন ? তুমি তো খুব বলতে, তাজ তোমায় আমি আমার বাড়িতে বউ করে নিয়ে যাবো। আমার মা বাবা তোমারও মা বাবা হবে। তোমার সেই চাওয়া পূরণ হয়েছে যে! আমি তোমাদের বাড়িরই বউ এখন।
--- নায়ায়া এটা আমি কখনোই মানতে পারবোনা। আমার জীবনে সবচেয়ে বিরক্তির মানুষ এখন আমার বাড়িতে আমার ভাইয়ের সাথে প্রেম করে বেড়াবে সেটা আমি একদম সহ্য করতে পারবোনা৷
---- আমার সামনে যখন প্রেম করে বেড়ানো হতো তখন আমার কেমন লাগতো? আর এখন আমারও প্রতিশোধ নেওয়ার সময়!
প্রেম করে বেড়াতো মানে,আর তোমার কিসের প্রতিশোধ তাজ??
পেছন থেকে পরাণের কথা শুনে আমি লাফিয়ে উঠলাম। সব শুনে ফেললো তাহলে...
চলবে,,,,,

0 Comments